Monday, March 11, 2013

ব্যবসায়িক সফলতার পিছনে ছুটন্ত এক কিশোরের জীবন কাহিনী

"তুমি যদি ব্যবসা করতে চাও তাহলে তোমাকে শুধু আজ অথবা আগামী কালকের চিন্তা করার চাইতে আরো বেশি অগ্রমুখী চিন্তা করতে হবে ।"


আইত্থিপাট কুলাপনভানিচ, ডাক-নাম 'টব' স্কুলজীবনে যাকে তার শিক্ষকরা 'গুড ফর নাটিং' ছাত্র বলে চিনতো । ক্লাশে অমনোযোগী, যাকে আমাদের শিক্ষকরা সহজে 'গাধা' বলে ডাকে এমনই একজন । বর্তমানে থাইল্যান্ডের অন্যতম একজন ক্ষুদে ধনকুবের । ব্যবসায় তার জীবনের সার্থকতা । সঞ্চল, জেদী কিন্তু অভঙ্গুর স্বভাব তাকে সফলতার পিছনে ছুঁটিয়েছে ।

১৫- ১৬ বছরের বয়সে আমরা তখনো দৌঁড়াদৌঁড়ি ছাড়িনি । বাবা-মার পরনির্ভরশীল সন্তান হয়ে কলেজে পড়ছি, যা বেশিরভাগ সন্তানই এই ১৬ বয়সে এমন পরনির্ভরশীল হয়ে স্বনির্ভরশীল হওয়ার কথা ভাবতেই পারে না । এই বয়সে টবের জীবন ছিলো অন্যরকম । পাঠ্যবইয়ে অমনোযোগী হলে ও অর্থ আয়ের বাসনা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে । সে অনলাইন ভিডিও গেইম এ আসক্ত হয়ে পড়ে । টুর্নামেন্ট জিতে সে প্রতিমাসে ৪ লক্ষ বাত (আনুমানিক ১০ লক্ষ টাকার সমমান) অনলাইন গেইম থেকে আয় করতো ।

একদিন হাইস্কুলে হঠাৎ একটা আকাশী রংয়ের মোটর গাড়ী নিয়ে হাজির হলে ক্লাশমেটরা চমকে যায় । কিন্তু রহস্য আদৌ গোপন থেকে যায় । অনেকেই মনে করেছে বাবার টাকা দিয়ে সে গাড়ীটি কিনেছে । তারপরের বছর কোনমতে হাইস্কুল শেষ করলে ও হাইস্কুলের মার্ক নিম্নমানের ছিলো বিধায় কোন পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় । ছেলের অধপতন দেখে বাবা ভীষন রেগে যায় । টব তার বাবাকে বলে দেয় নিজের অর্জিত আয় দিয়ে সে কোন এক প্রাইভেত ইউনিভার্সিটিতে পড়বে । তাই হলো । তখন তার বয়স সতেরো (১৭) । ভার্সিটিতে রীতিমতো ক্লাশ না করে সারাদিন ভিডিও গেইম নিয়ে পড়ে থাকতো । এমনই সময় বাবার কোম্পানি অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ে । কাকতালিয়ভাবে টবের ভিডিও গেইমের একাউন্ট ও জব্দ হয়ে যায় । তখন টবের বয়স ১৮ বছর । শুরু করে বাজারের দোকানে দোকানে ঘুরা এবং বিভিন্ন জিনিসের দাম, ব্যবহার, বেচাবিক্রি নিয়ে প্রশ্ন করা ।

একবার ৫০ টি ভিসিডি প্লেয়ার কিনে এনে লোকসান দেয় । বাবা হতাশ হয়ে গালাগালি করে । তারপর এক মেলা থেকে কিনে আনে এক বাদাম ভাজি করার মেশিন । তার মামাকে নিয়ে লোকেশনের জন্য বিভিন্ন শপিং মলের সামনে ঘুরাফেরা, দর কষাকষি করে । এভাবে তার বাদাম ব্যবসা (যা বর্তমানে অন্যতম জনপ্রিয় এক ব্যবসা) সফল পেতে থাকে । বাবা ব্যাংক থেকে ৪০ মিলিয়ন বাত ঋণের বদলে পরিবারের সুন্দর বাড়িটি নিলামে দেয় এবং পরে স্থায়ী বসবাসের জন্য চীনে চলে যায় । সেখানে টবের এক বড়বোন এবং ভাই চাকুরী করতো । টব থেকে যায় এক বয়ষ্ক মামার সঙ্গে । বাবার রেখে যাওয়া ৪০ মিলিয়ন ঋণের কথা থাকে অস্থির করে তোলে । বাদাম ব্যবসা ভালো চললে ও এতো বড় মাপিক ৪০ মিলিয়ন ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয় । তাই সে অন্য এক ব্যবসার কথা চিন্তা করে । একদিন তার প্রেমিকাকে সীভীড (সমুদ্র - শৈবাল) খেতে দেখে মনে সীভীডের ব্যবসা চলে আসে । বাজার থেকে কয়েক শত ব্যাগ সীভীড এনে মামাকে নিয়ে ভাজি করতে করতে দুজনই ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিন্তু ভালো ভাজতে পারলো না; লোকসান গেলো । এভাবে লোকসান যেতে শুরু । অন্যদিকে তার ভালোবাসার মানুষটি সবকিছু ছেড়ে ভালো পড়াশোনা করার জন্য চাপ দিতে থাকে । কঠিন ভালোবাসার মান, অভিমান শুরু হয় । প্রতিদিন ক্লাশের নোটগুলো ফটোকপি করে টবকে দিয়ে আসতো সে । টবের বর্তমান এবং ভবিষ্যত নিয়ে জানতে চায় প্রেমিকা । টব উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যেতো । তাতে প্রেমিকা ভুল বুঝে টবকে ছেড়ে চলে যায় ।



টব আরো বেশি একাকী এবং নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে । স্কাইট্রেনে একদিন তার প্রেমিকাকে অন্য এক ছেলের হাত ধরে চলে যেতে দেখলে সে প্রতিজ্ঞা করে ব্যবসায় তাকে সফল হতে হবে । সুন্দর গাড়ীটি শেষ সম্বল হিসেবে বিক্রি করে দেয় । ব্যাংকে দারস্ত হয় লোনের জন্য । ব্যাংক এমন ছোট বয়সী তাছাড়া বাবার রেখে যাওয়া ঋণের জন্য নতুন লোন দিতে অপারগতা দেখায় । পরে এমন সময় ভার্সিটির এক শিক্ষকের রেকর্ড করা ব্যবসায়িক লেকচার মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে উদ্ভাবনমূলক নতুন এক ব্যবসায়ী আইডিয়া উদয় হয় । সামনে ৭-ইলেভেন মিনি স্টোর । ভাবে কোন এক প্রডাক্ট যদি এই ৭-ইলেভেনে সাপ্লাই দেয়া যায় তাহলে সারাদেশে ৩,০০০ ব্রাঞ্চে সে সাপ্লাই দিতে পারবে । ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ৭-ইলেভেনের হেড অফিসে এক এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ডাইরেক্টরের সাথে দেখা করে । তার প্রডাক্ট সেদিন ডিসকোয়ালিফাইড হলে সে আরো বেশি ভেঙ্গে পড়ে । একবিকেলে চাইনাতে মাকে ফোন করে সব জানায় । মা কান্না করতে করতে বলে সবকিছু ছেড়ে চলে এসো এখানে । টব তার মাকে বলে, মা চিন্তা করো না দেখো একদিন আমি সব ঋণ পরিশোধ করে তোমাদের দেশে ফেরিয়ে নিয়ে আনবো ।

নিজের সীভীডকে উন্নতমানের প্রডাক্ট বানানোর লক্ষ্য ফুড প্রোসেসিং ডিপার্টমেন্টে এক প্রফেসরের সাথে দেখা করে । তারপর প্যাকেজিং নিয়ে ভালো জ্ঞান হলে তার বাবার অন্য এক পুরান ঘরে ফ্যাক্টরি বানিয়ে ৭-ইলেভেনের টিমকে ইনভেস্টিগেট করতে আহ্বান জানায় । সেদিন তার সীভীড কোম্পানিকে এপ্রোভড করে ৭৩,০০০ প্যাকেট সীভীড অর্ডার দেয়া হয় । ব্যাংক থেকে ১০ মিলিয়নের লোন এপ্রোভড হয় । সে লোন দিয়ে কোম্পানিকে আরো বৃদ্ধি করে । টবের বয়স তখন ১৯ (উনিশ) । এভাবে ব্যবসায়ের জীবনে সার্থকতা চলে আসে । সেবারের মতো প্রথম বছরে তার ইনকাম হয় ৮০০ মিলিয়ন বাত, তার সীভীড প্রোডাক্ট চলে ৭-ইলেভেনের ৩,০০০ টি ব্রাঞ্চ । এবং বাবার ব্যাংকে কাছে রেখে যাওয়া ৪০ মিলিয়ন ঋণ পরিশোধ করে মাকে দেশে আসার জন্য ডেকে পাঠায় ।   ২,০০০ কর্মচারী কাজ করে তার ‘Tao Kae Noi’ কোম্পানিতে । এশিয়া বাদে ও বিভিন্ন দেশ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, আমেরিকাতে তার প্রডাক্ট সীভীড এক্সপোর্ড করে ২০১২ সালে ২ বিলিয়ন বাত আয় হয় ।

বর্তমানে তার বয়স ২৭ বছর । মাকে নিয়ে সেই পুরাতন বাড়িতে বসবাস করছে ।

“We must not be shy to ask questions about things that we don’t know. Don’t be shy about knowledge. My strategies for success are very simple. First strategy is ‘to ask’, the second is also ‘to ask’ and then ‘to ask’. It’s as simple as that.”

তার বাস্তব জীবনের কাহিনী নিয়ে এক মুভি ও বানানো হয়েছে ।

http://www.youtube.com/watch?v=oGLSpomC5C4

নৈতিকতার বিপর্যয় অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি

একটি সমাজকে ধ্বংস করতে হলে 'নৈতিকভাবে অবক্ষয়' ঘটাতে হয় । নৈতিকতাহীন সমাজে অরাজকতা বিরাজমান, মানবিক গুনাগুন জীর্ণ । এভাবে বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানের ক্ষয় ঘটে । সমাজের মানুষগুলো ভালোমন্দ যাচাই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে । ফলে বিপদগামীতার দিকে হতাশাকে জড়িয়ে ধরে ছুঁটে ।

একসময় এমনই ঘটেছিল পুরাতন বৈশালি নগরে । বৈশালি ছিল বজ্জীদের রাজধানী । বজ্জীরা মূলত তিন গোষ্ঠিতে বিভক্ত ছিল - লিচ্ছবি, মল্ল এবং শাক্য । তাবৎ বিশ্বে বৈশালি ছিল পুরাতন সমৃদ্ধ প্রজাতন্ত্র নগরগুলোর অন্যতম একটি । অজাতশত্রু বারবার আক্রমণ করা স্বত্তে ও জয়ী হতে না পারায় একদিন তার একমন্ত্রীকে গৌতম বুদ্ধের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন । গৌতম বুদ্ধ রাজা অজাতশত্রুর মন্ত্রী ভস্সাকরকে বলেছিলেন যতদিন পর্যন্ত বর্জ্জীরা সাতটি অপরিহার্য নিয়মনীতি পালন করবে ততদিন তারা অপরাজেয় হয়ে থাকবে । সেগুলো;

     ১. মতামত ও পরামর্শের জন্য ঘন ঘন মিটিং,
     ২. কাজের মধ্যে ঐক্য,
     ৩. বিচারের হুকুম ও ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য,
     ৪. গুরুজনের প্রতি সম্মান,
     ৫. নারীদের প্রতি সম্মান ও নারীত্ব রক্ষা,
     ৬. ঐতিহাসিক স্থান গুলোর পবিত্রতা রক্ষা, এবং
     ৭. জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের সুরক্ষা

তবুও একদিন অজাতশত্রু চক্রান্তে অবতীর্ণ হয়ে বজ্জীবাসীদের মধ্যে ঐক্যতাকে ধ্বংস করে দেয় । একে অপরের প্রতি বিশ্বাসকে অবিশ্বাসে রুপ দেয় । গুরুজন, নারীদের প্রতি সম্মান ধসে পড়ে, ঐতিহ্যে হারিয়ে যায়, জ্ঞানীগুনিদের সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হয় আর এভাবে অজাতশত্রু বৈশালী নগরিকে দখল করে ।

উপরোক্ত পুরাকালে সংগঠিত ঘটনাটি পার্বত্য চট্রগ্রামের জন্য খুবই সমসাময়িক এবং বাস্তবসম্মত । জুম্মজাতিসমূহের মধ্যে অনৈক্যের ফাঁটল ঘটাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাশীলরা বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছে । জাতিসমূহের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করিয়ে দেয়ার লক্ষ্য জাতিদের মধ্যে পৃথক পৃথক সংসদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে । যুবকদের মধ্যে নেশা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছে । চক্রান্তে অনেক জ্ঞানীগুনি ব্যক্তিকে অকালে হত্যা করা হয়েছে । এভাবে জুম্মজাতিসমূহ নিজেরা নিজেদের মধ্যে দিনেদিনে অবিশ্বাসকে পুঞ্জিভূত করে চলেছে যার করুণ পরিণতি আজকের ভ্রাতৃসংঘাত । শোনা যাচ্ছে জুম্ম ছেলেরা ও আজকাল ধর্ষণে জড়িত হয়ে যাচ্ছে । ঐতিহ্যের প্রতি নেই আনুগত্য । সচেতন হতে না পারলে এভাবে দিনেদিনে নৈতিকতা ভূলন্ঠিত হয়ে অচিরে জাতি, সমাজের অস্তিত্ব চিরতরের জন্য হারিয়ে যাবে ।