Wednesday, April 25, 2012

মানবতাবাদ বনাম মনুষ্যত্ববোধ



মানবতাবাদ জিনিসটি কি (?) এটিও কি এক ধরনের মতবাদ -নাকি বিপ্লবী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ (?) অথবা মনুষ্যত্বের দায়বদ্ধতা (?) খুবিই জটিল এবং চিন্তার বিযয় ও বটে। কাকতালিয়ভাবে শব্দটি আমাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলতে শুরু করেছে -যদি ও ১৯৯০-এর নভেম্বরের দিকে ভারতের ত্রিপুরায় শরনার্থী শিবিরে থাকাকালীন জেনেছিলাম আমাদের খোজঁ খবর নিতে নাকি ডেনমার্ক থেকে এক মানবাধিকার কর্মীর দল এসেছে। বয়স তখন ৫ এবং ৬ বছরের মধ্যে। অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ছুঁটে গিয়েছিলাম সাদামানুষের সেই দলকে এক পলকের জন্য দেখবো বলে। অনেকের মুখে-মুখে শুনেছিলাম -এদের অনেকেরই নাকি এলএলবি পাশ করেছে। অধ্যায়নের সর্বোচ্চ স্তর। মনেমনে তখন ভাবনার ঢোল ঝুলতেছিলো আমারও, আমাকে ও একদিন এমন অধ্যায়ন করতে হবে -যেনো এরকম হাজারো মানুষের ভীরে হাততালির গুন্ঝন শুনতে পায় -মানুষের মনে আমি যেমন আনন্দ পাচ্ছি সেভাবে আনন্দ কিংবা উদ্দীপনা যোগাতে পারি। স্বপ্নের বিভোরে ভেসে চলে সেই অবুঝ বালকের মন। স্বপ্ন দেখতে থাকে অনাবিল আনন্দে -সে বুঝতে চাইতো না যে সে কতটা অহেলিত এবং নির্যাযিত। মা-বাবার অবাধ্য হয়ে জীবনের মর্ম কি খুজেঁ চলে -বনে-জঙ্গলে-নদীনালা-খালবিলে। হিন্দী সিনেমা দেখতে বাবার কাছে টাকা চেয়ে নেয় -আর ছুটেঁ যায় সুতাবিহীন ঘুড়ির মতো। উড়তে থাকে আকাশের শূণ্যদ্বীপে -মুক্তমনে -স্বাধীনভাবে। নেই কোথাও বিধিনিষেধ -রিলিজিওন-এর দায়বদ্ধতা। শুধু ঘুরে বেড়ানো আর সময়ে পাঠশিক্ষা এবং ক্ষুধা নিবারণ করা। তবুও সে স্বপ্ন দেখে একদিন এলএলবি পাশ করে -মানুষের প্রশংসা কুড়াবে। কি কঠিন স্বপ্ন সেই অবুঝ বালকের (?) এখন সে অবুঝ বালকটি একাকী বসে চলে যায় সেই সোনালি স্বপ্নের যুগে আর হাসে। কি জটিল মানুষের এই জীবন (?)।

যাহোক, প্রসঙ্গে আসি যা নিয়ে কিছু লিখবো বলে জটিল সৃষ্টির সাহায্য নিয়েছি। প্রসঙ্গটা হচ্ছে “মানবতাবাদ” কিংবা “হিউমিনিজম”কে নিয়ে। আমি এর সচ্ছতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সন্দেহ প্রকাশ করি, যখন ব্যাঙের ছাতারমতো গজানো “মানবাধিকার সংস্থার” ফলকগুলোকে বিভিন্ন গণমাধ্যমসমূহে দেখি। “মানবতাবাদ এবং মানবাধিকার” -এর দুয়ের পার্থক্যটা জানতে আমার মনের কৌতুহল বাড়ে। এর জন্য যে তারপর বেশি বই পড়েছি তা ও নয় -বরং সকাল-বিকেলে নিজের মনুষ্যত্ববোধের কাছে প্রশ্ন ছুড়েঁছিলাম আর উত্তর খুজেঁছিলাম। তাই আমার এই লেখাটি কেবলমাত্র এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই ফসল। এক মানুষের সত্যিকার মনুষ্যত্ববোধ কোথায় তা অনুসন্ধান করতে আমাকে এই ২৬ বছর বয়সে আসতে হয়েছে। এখন নির্ধিদায় বলতে পারি “মানুষের গুণাবলীর স্থান বাইরের কোথাও নয় -বরং একজন ব্যক্তিতেই সেসব নিহিত থাকে আর সেসব গুণাবলীকে আত্ম-প্রচেষ্টার মাধ্যমে আবিষ্কার করা হচ্ছে জীবনের আসল উদ্দেশ্য -তাই স্বপ্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজস্ব মনুষ্যত্ববোধকে খুজেঁ পেতে হয় -যা সবকিছুর উর্ধ্বে”। এর আগ পর্যন্ট কেউ সত্যিকার মানবতাবাদী হতে পারবে না -সে যতবড় প্রসিদ্ধ কিংবা নামজাদা মানবতাবাদী কর্মী হোক -যে পর্যন্ট না সে নিজেকে শুধু এক মানুষ হিসেবে চিনতে পারে। পৃথিবীতে বর্তমানে হরেকরকমের ব্যবসা হয় -এরই মধ্যে “মানবাধিকার” ও একটি -যাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো এক ঘটনার পরবর্তীতে -উক্ত ঘটনারই পরিপ্রেক্ষিতে পত্রিকায় লেখা, কিংবা টিভিতে প্রচার করা, অথবা ওয়েবসাইট-এ নিজস্ব মতামতের উপর ভিত্তি করে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা -এই হলো বর্তমান মানবাধিকার কর্মিদের কাজ। খুবিই সীমিত এবং হীন এক ব্যবসা। একদিন এক নামকরা মানবাধিকার কর্মীর সাথে দেখা হলে নিজেই নিজের গোপনতা প্রকাশ করলেন -বললেন যে কোনো এক সময় মালদ্বীপ সরকারের লঙ্ঘনকৃত অপরাধের বিরুদ্ধে লিখতে যাবে শুনে -সরকার নাকি উনাকে ২ কোটি রুপি দিতে রাজী হয় -তার বিনিময়ে তবু ও সংবাদ প্রচার না করা। আমিতো জানি সবগোপনী্য়তা। খেলেও কেউ কি কিছু বলবে -হ্যাঁ, আমি খেয়েছি। দিলে ও কেউ কি বলবে -হ্যাঁ আমি এতো লক্ষ টাকা উনাকে দিয়েছি সে যেনো সংবাদ না ছাপাই। খুবই নিরাপদ পেশা -এককথায় ঠান্ডামাথায় দূর্নীতি। তবুও উনাদের কমবেশি যে মানবিক মূল্যবোধ নেই তা অস্বীকার করছি না।

পার্বত্য চট্রগ্রামে যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয় -মূলত দুধরনের সংবাদ গনমাধ্যমের কাছে পৌঁছাতে সংবাদমাধ্যমে ছাপানো হয়। এক: পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নিরীহ বাঙ্গালীদের পল্লীতে তান্ডবলীলা চালিয়েছে, এর বর্ণনা দিতে রামায়নের কাব্য বানানো হয়, নতুবা- দুই: মাঝেমাঝে আসতে পারে নিরপেক্ষ নমুনায়, যেমন পাহাড়িদের গ্রামে আগুন -যা ঘটেছে মূলত এক অঙ্ঘাত দলের কারণে। এই অঙ্ঘাত দলটি কে বা কারা -ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা আর মিলে না। আর দেশহিতৌষী-বরেণ্য-সম্রাঙ্ঘী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কে একবিন্দু কথা বলার সাহস রাখে। এখানে এসে সব সত্য ভূ-গর্ভের নিচে চলে যায়। সরকারকর্তৃক লোকদেখানো মানবাধিকার সংঘ ঘটন করা হয় -ঘটনার সত্যটা কতিয়ে দেখবে বলে। আদৌ কি কোনো সত্য উৎঘাটন হয়েছে (?) যা হয়েছে সবটা হয়েছে এর উল্টো -বিকৃতভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপর ভর করে পাহাড়িদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী মহল হিসেবে। যাদেরকে নিয়ে মানবাধিকারের সংঘ ঘটন করা হয়েছে -উনারাতো আবার অল্পশিক্ষিত কিংবা নির্বোধ ব্যক্তি ও নন -উনারা ওতো কোনো না কোনোভাবে মানবাধিকারের পেশা নিয়ে জড়িত। তাহলে -সত্য কেনো তবুও গোপন থাকে (?)। কারণ একটাই, উনারা যদিও মানবাধিকারের কথা বলতে চান -কিন্তু সত্যিকার অর্থে মানবতাবাদী হতে পারেন নি -অর্থাত্হ মনুষ্যত্ববোধ সম্পর্কে জ্ঞান পরিধি সীমিত -সোজা কথায়, মানবতা কি জিনিস তা ভালোভাবে হৃদয়ালব্ধী হয়নি অথবা জানেন না। হয়ত বা হতে পারে বাঙ্গালী জাতিয়তাবোধ আদৌ উনাদের পিছু টানে -নতুনা মাইনে কমবে বলে চিন্তা করে। এই হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের কার্যকলাপ। হবে না ও কেনই বা -যে আমেরিকা জাতিসংঘকে সিংহভাগ অর্থ যোগান দেয় বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্টার জন্য -আর সে আমেরিকাই আবার আফগানিষ্টান এবং ইরাকে বোমা ফাটে সন্ত্রাসী নির্মূল করবে চলনায়। আবার মানবতার দরদ দেখিয়ে উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমারের মতো অনগ্রসর দেশগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কি নিষ্ঠুর মানবজাতি (?)। সবদিক দিয়ে অবর্ণিত ক্ষতি নিরীহ জনসাধারণের উপরই সাধিত হচ্ছে।

মানুষের একটাই স্বভাব সহজে অন্য আরেকজনকে প্রভুত্ব আসনে বসিয়ে রাখা -যারপরিপ্রেক্ষিতে রচনা করতে পারে নতুন অন্য এক কেতাব -আমার প্রভু জনমানুষের কথা ভেবেছিলেন বলে নিজের জীবনের কথা চিন্তা করেন নি। আমার প্রভু জনদরদী-হৃদয়বান ব্যক্তিদের একজন -এক কথায় অবিনশ্বর এবং ইত্যাদি…..ইত্যাদি। এইসব হচ্ছে একধরণের সুবিধাবাদী মহলের প্রচারণা। মানবতাবাদের টুপিটি কিন্তু এনারা আগে পড়েন। এনারা চেঁচিয়ে গলাফাতান -যেকোনোভাবে হোক মানুষদের সামনে মানবতাবাদী সাজতে হবে। আবার নিরীহ কিন্তু অল্পশিক্ষিত মানুষেরা এনাদের কথা সহজেই বিশ্বাস করেন -কারণ অধিকাংশ সমাজের জনগোষ্ঠি আদৌ স্বশিক্ষিত হতে পারেননি যদিও উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন বটে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে “মানবতাবাদ” জিনিসটা কি -বস্তু নাকি ব্যক্তি (?) মানবতাবাদের সত্যিকার তাৎপর্য অন্য আরেকজনকে হৃদয়ক্ষম করানো এক ধরনের দুরদিগম্য ও বটে -কেননা মনুষ্যত্বকেতো নিজের মাঝে আগে খুজেঁ পেতে হয়। মনুষ্যত্ববোধ হচ্ছে নিজেকে আগে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে চেনা -যেখানে আটাঁ থাকবে না রিলিজিওন-জাতি-বর্ণের ভেদাবেদ। নিজেকে আগে অনুধাবণ করা শুধুমাত্র এক মানুষ হিসেবে -তারপর চিন্তার গভীরে নিয়ে যাওয়া সত্যিকার মানবিক গুণাবলীগুলোকে অন্বেষনের প্রয়াসে। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করা -এক মানুষ হিসেবে আমার কি কি গুণাবলী থাকার প্রয়োজন (?)। ধরুণ, আমি চিন্তা করছি আমার মানুষ হিসেবে দরকার -অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থান। তারপর ধারাবাহিকভাবে চলে আসে ভাষাগত-সংষ্কৃতিগত মৌলিক অধিকারগুলোর কথা। যা আমার আছে -অন্যদের ও থাকা আবশ্যক, যা আমি পারি না -অন্যদের ও পারতে বাধ্য করবো না। আমার যা স্বাধীনভাবে চিন্তাবিকাশের অধিকার -আমার মতো অন্য আরেকজনওটো চিন্তা করতে পারে -যা উনার ও মৌলিক অধিকার। আমি যেমন রক্তে-মাংসে গড়া এক মানুষ, সে ও টো এক মানুষ। আমার থাকতে পারে উনার কেনো থাকতে পারে না (?)। অর্থাৎ-প্রথমে নিজের মূল্যবোধকে আবিষ্কার করা -আর অন্যদের ও সেভাবে দেখা। তাকেই বলে মানবতাবাদ। আর এই মানবতাবাদের সত্যিকার তাৎপর্যকে প্রচারের মাধ্যমে জনমানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যতাই হচ্ছে মানবাধিকারের সংস্থাগুলোর মূলমন্ত্র হওয়া উচিত বলে আমি নির্ধিদায় মনে করি।

পরনিন্দা নাকি আত্ম-সমালোচনা ??

মানুষের স্বভাবগত সংষ্কার পরিবর্তন করা খুবই কঠিন এবং এক ধরনের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা; যার পরিপ্রক্ষিতে জীবনে অনেক জাগতিক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা স্বত্ত্বে ও চেনা হয়ে উঠে না । অচেনা বাস্তবতাগুলো বারবার আঘাত দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়া স্বত্ত্বে ও আমাদের খুব কম জনেরই বাস্তব চেতনার উদ্ভব ঘটে; তাই হিংসা-বিদ্বেষগুলো প্রকর থেকে প্রবলতর হয়ে বেড়ে উঠে । হারানো ব্যথা-বেদনায় যখন স্পর্শকাতরে পরিপূর্ণ হৃদয় ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়, পরাজয়ের হতাশা যখন গ্রাস করে রাহুরুপী ধারণ করে তখনিই শুরু হয় তীব্র হা-হুতাশ । বাকী থাকে শুধু আক্ষেপ এবং সমবেদনা; নির্দয়ের সর্বশেষ স্তর ।

সবকিছুর সাথে আমরা অচেনা এবং অজানা হয়ে বসবাস করতে চাই - একসাথে বসবাস করেছি বহু বছর যাবৎ তবু ও চিনতে পারিনি "হতাশা" কি ? একসময় হতাশাই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু, নিদ্রার পরম শত্রু, ক্ষুদার্ত পাকষ্থলির জ্বালানিবারক কিংবা পিপাসু শরীরের দূর্বলতা । তবু ও ভুলে গিয়েছিলাম পিছনে ফেলে আসা সেই বন্ধুসুলভ 'হতাশা'র কথা - কিন্তু সে যে কখনো আমাকে ভুলে থাকার নই -সুযোগ ফেলেই ঝাঁপড়ে ধরবে; খেয়ে ফেলবে জটিল শরীরটাকে - বাকি রাখবেটা কি বলা কঠিন । কিন্তু এটো বছর যার সাথে কাটিয়েছিলাম সেই 'হতাশা'কে আমার কি একবার ও চেনার দরকার ছিল না (?) যে আমাকে ভুগিয়েছে -আমাকে মরণের পথে ধাবিত করেছে -সবকিছু লুটে নিতে চেয়েছিল সেই হতাশাকে আমি এতো সহজে কেনো ভুলতে বসলাম (?) আমাকে একজনই ব্যর্থ করতে চেয়েছিল -জীবনকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল - চোষকের ন্যায় আমার শরীরে যা রক্ত ছিল সব চুষে নিতে চেয়েছিল -কাঁদিয়েছিল - আঘাতে জর্জরিত করে শরীরের ক্ষুদ্রানু কোষগুলোকে দূর্বল করে রেখে দিয়েছিল দু-দুটো বছর -সেই "হতাশা"কে আমি ভুলতে বসেছিলাম । আমি স্বার্থপরের ন্যায় আচরণ করতে চেয়েছি - পারিবারিক দ্বায়িত্ববোধকে বিসর্জন দিয়েছিলাম - কেননা সাংসারিক বন্ধন ছিন্ন করে আমি শুধু এক সত্যিকার মানুষ হতে চেয়েছিলাম । আমি হতাশা'কে আর উপলব্ধি করতে চাই না -বরং আমি এখন চিনতে চাই -বুঝতে চাই । এই হতাশাকে আমি যা খুশি তা বলতে পারি, গালমন্দ করতে পারি; কারণ সে ছিল আমার - ভবিষ্যতে থাকবে আমারই । ইহা পরনিন্দা নই বরং আত্ম-সমালোচনা । আমরা ভুল করে পরনিন্দা এবং আত্ম-সমালোচনাকে এক করে গেঁথে ফেলি -যার চুড়ান্ত পরিণতি জটিলতা - এবং মনুষ্যত্বজ্ঞানহীনতা ।

যৌক্তিক সমালোচনা কখনো পরনিন্দা নয়; যৌক্তিক সমালোচনাগুলো সবসময় ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অনুকুলে হয়ে কাজ করে; আর অন্যদিকে পরনিন্দা এক মানুষকে ব্যর্থতার সম্মুখে ধাবিত করে । পরনিন্দার কোন যৌক্তিকবোধ থাকে না -যা তাকে হচ্ছে হীন মনমানসিকতার জঞ্জাল -হিংসা, দ্বেষ, বিদ্বেষে পরিপূর্ণ । সেজন্য পরনিন্দুকরা কখনো যৌক্তিক সমালোচনা করতে জানে না; কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্যমূলক চক্রান্তে তাদের স্থান সুউচ্চে । আমাকে সমালোচনা করা হয় কারণ আমার রস-কসের উপলব্ধিতা ভিন্ন ধরনের; কারণ আমি কখনো টাকাকে মুখ্য মনে করিনি । আমাকে ও পরনিন্দার কবলে বহুবার পড়তে হয়েছিল, অনেক সময় আঘাত ও পেয়েছিলাম মানুষদের মনমানসিকতাগুলো সেরকম হীন দেখে । তবে এর সমালোচনা আমি প্রকাশ্য করেছহিলাম এটে লুকিয়ে রাখার ছিল না ।

আমাদের বাংলাদেশে একটা জিনিস খুব প্রবলভাবে চর্চা হয় সেটি হচ্ছে "পরনিন্দা" - অনেকক্ষেত্রে আড্ডাকে হাসিমুখর এবং প্রাণোজ্জ্বল করে তোলার জন্য ও পরনিন্দাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হয়ে থাকে । দুই-তিনজনের মহিলা মিললে হয়ে যায় ভালো এক আড্ডা -আর চলে রীতিমতো পরনিন্দা চর্চা । আজকাল পুরুষরা ও পিছিয়ে নেই । আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদরা এগিয়ে । এরা আত্ম-সমালোচনাতো দূরের কথা যৌক্তিক সমালোচনা পর্যন্ত কিভাবে করতে হয় ভুলে গেছে -বরং চলছে সমালোচনা নামে "পরনিন্দা" । এভাবে দেশের কথাতো বাদই দিতে হয় -এক ক্ষুদ্র গ্রামকে ও উন্নয়ন করা সম্ভব কিনা সন্দেহ । যেদিকে রাত কাটিয়েছি শুনেছি একে অন্যকে যা খুশি মাটির ভরাট দিচ্ছে -অনেক সমস্যা আর রীতিমতো ঢাল ছুঁড়াছুড়ি । আমাদের বাংলাদেশের মানুষের অবনতির অন্যদের মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে এটি । আমরা দিনদিন উগ্র হয়ে উঠছি; কারণ বেড়ে উঠার পরিবেশ আমাদেরকে তা হতে বাধ্য করছে । প্রতিবাদ করা খারাপের কিছু না কিন্তু আমরা প্রতিবাদ করছি যেখানে সেখানে -লাগামহীন এবং যুক্তিবিহীনভাবে । কারণ ছাড়া একে অন্যর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছি আর ছোটদের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা ও ভুলে গিয়েছি -এর প্রতিফল হিসেবে আমাদের ও ছোটদের কর্তৃক লাঞ্জনার স্বীকার হতে হচ্ছে । আমরা ভুল করার পর ও ভুলকে মানতে নারাজ -চিনতে চেষ্টা করি না । এক-দুবার করার পর কিছু একটা যেখানে শিখবো কিন্তু অভ্যসগতভাবে শিখে ফেলি ভুল কিভাবে বারবার করা যায় ।

আমাদের অভ্যসটা হচ্ছে নিজের ভাত খেয়ে পরের হয়ে বাঁচা যা পরিবর্তন করা অতীব জরুরী


অবশেষে - পরনিন্দা করলাম নাকি আত্ম-সমালোচনা ?

অস্তিত্বহীন প্রকৃতিঃ যেখানে তুমি, আমি এবং সে বলতে কেউ নেই



নাগার্জুনের শূন্যতা দর্শন আমাকে ভাবাচ্ছে । বুদ্ধের অনাত্মা, তদুপরি উপনিসদের আত্মা, চার্বাকের নাস্তিবাদ (ধ্বংসবাদ), পশ্চিমাদের পুণঃজম্মহীন আত্মাবাদ । প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আত্মজ্ঞানে যা ধরে নির্বাক হয়ে ভাবছি । পাশাপাশি ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিয়ে ও গভীর ভাবনায় পড়ছি । এখানে 'আত্মজ্ঞানের' কথা বলছি বলে আত্মাকে স্বীকার করছি তা নয়; বরঞ্চ নিজস্ব ব্যক্তির পরিধিকে বুঝাতে চেষ্টা করা ।

ইতিহাস হচ্ছে পরিবর্তনের ইতিহাস; স্থীতিশীলতা বলতে কিছু নেই সেটাইতো বিবর্তন । অনেককিছু অগোচালো । মানুষরা প্রকৃতিগতভাবে একটু জেদী এবং স্বার্থপর । মহাবিশ্ব একটা বিস্তরক্ষেত্র; শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত । সীমাহীন, অনন্ত তবে পরিবর্তনশীল এবং বিবর্তনের দিকে অনবরত ধাবিত যাকে বুদ্ধের ভাষায় 'অনিত্য' বলা চলে আর উপনিসদের ভাষায় 'মহাব্রাক্ষ্ম' বলা হয়ে থাকে ।

বিজ্ঞান আগের চেয়ে অনেকগুন বেশি অগ্রসর; তাই নতুন দর্শনতত্ত্বের বিকাশ আগের তুলনায় অনেক কমেছে । বুদ্ধ নাস্তিকতার বিরোধী ছিলেন বলে জানি, তবে তখনকার নাস্তিকগুলো বর্তমান সময়ের নাস্তিকদের চেয়ে ভিন্ন ছিল । তাদের কাছে 'ভালো-খারাপ' সবই ছিল অর্থহীন' সোজা কথায় 'কর্ম' বলতে কিছু নেই । তবে বর্তমান সময়ের নাস্তিকতার মাঝে 'ভালো-খারাপ'কে অনেকবেশি মূল্যায়ন করা হয় 'কর্মকে' ও ।

সাধারণভাবে দেখলে...পৃথিবীতে সকল মানুষই নাস্তিক এবং সকলেই আবার আস্তিক । ধর্মবিদরা যে নাস্তিক নন তার প্রমাণ না থাকলে ও তারা যে বিশেষ বিশেষক্ষেত্রে নাস্তিক তার প্রমাণ মিলে যখন তারা অন্যর দর্শন এবং ধর্মকে অবিশ্বাস করেন; বিপরীতে নিজের ধর্ম, দর্শনকে অস্তিত্বশীল বলে মনে করেন । বিজ্ঞানের পরিভাষায় আল্টিমেট বলতে কোন টার্ম এখনো নেই তাদের কাছে এটা বিশ্বাস; বদলে যদি যায় প্রোটন ভেঙ্গে যদি 'অদৃশ্য শক্তি' হয় তখন চিন্তাধারা বদলাবে ।

পরিশেষে, আমি না থাকলে, তুমি নেই, তুমি না থাকলে সে নেই । তুমি, আমি এবং সে মিলে সমাজ গড়েছি, সভ্যতা বানিয়েছি, জাতি রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছি । বৈচিত্রতার জন্য বিচিত্র এই পৃথিবী, তাই সুন্দর । মানবতাই তো হল ভালো-খারাপের উৎস । প্রকৃতি হচ্ছে আমাদের শিক্ষক । প্রতিটি ধূলিকণা, গাছপালা, লতাপাতাতে ও রহস্য লুকিয়ে আছে । রহস্য উদ্ভাবনের জন্য বর্তমানের বিজ্ঞান । পুরাতনকালে বিজ্ঞান ছিল না বলে মানুষ লতাপাতা খেয়ে জীবনধারণ করেনি তা নয় । সবল দেহ নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়েছে তখনকার সভ্যতার মানুষ । আয়ুর্বেদ জাতীয় চাইনিজ ট্রাডিশনার চিকিৎসার উপকরণ হলো লতাপাতা, বনজ ফলমূল । আমরা সবাই একে অপরের পরিপূরক ।

অস্তিত্বের জন্য লড়াই চলছে, চলবে অনন্তকাল যতদিন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে । তাই অস্তিত্বহীনতাকে উপলব্দি করা প্রয়োজন । যেখানে তুমি, আমি এবং সে বলতে কেউ থাকবে না সেখানে পৃথিবীর বস্তু-আদর্শকে সংজ্ঞায়ন করবে কে ?

তারপর ও কেন বলছি অস্তিত্বহীন প্রকৃতিঃ যেখানে তুমি, আমি এবং সে বলতে কেউ নেই ।