মানবতাবাদ জিনিসটি কি (?) এটিও কি এক ধরনের মতবাদ -নাকি বিপ্লবী চেতনারই
বহিঃপ্রকাশ (?) অথবা মনুষ্যত্বের দায়বদ্ধতা (?) খুবিই জটিল এবং চিন্তার
বিযয় ও বটে। কাকতালিয়ভাবে শব্দটি আমাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং
নতুনভাবে ভাবিয়ে তুলতে শুরু করেছে -যদি ও ১৯৯০-এর নভেম্বরের দিকে ভারতের
ত্রিপুরায় শরনার্থী শিবিরে থাকাকালীন জেনেছিলাম আমাদের খোজঁ খবর নিতে নাকি
ডেনমার্ক থেকে এক মানবাধিকার কর্মীর দল এসেছে। বয়স তখন ৫ এবং ৬ বছরের
মধ্যে। অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ছুঁটে গিয়েছিলাম সাদামানুষের সেই দলকে এক
পলকের জন্য দেখবো বলে। অনেকের মুখে-মুখে শুনেছিলাম -এদের অনেকেরই নাকি
এলএলবি পাশ করেছে। অধ্যায়নের সর্বোচ্চ স্তর। মনেমনে তখন ভাবনার ঢোল
ঝুলতেছিলো আমারও, আমাকে ও একদিন এমন অধ্যায়ন করতে হবে -যেনো এরকম হাজারো
মানুষের ভীরে হাততালির গুন্ঝন শুনতে পায় -মানুষের মনে আমি যেমন আনন্দ
পাচ্ছি সেভাবে আনন্দ কিংবা উদ্দীপনা যোগাতে পারি। স্বপ্নের বিভোরে ভেসে চলে
সেই অবুঝ বালকের মন। স্বপ্ন দেখতে থাকে অনাবিল আনন্দে -সে বুঝতে চাইতো না
যে সে কতটা অহেলিত এবং নির্যাযিত। মা-বাবার অবাধ্য হয়ে জীবনের মর্ম কি
খুজেঁ চলে -বনে-জঙ্গলে-নদীনালা-খালবিলে। হিন্দী সিনেমা দেখতে বাবার কাছে
টাকা চেয়ে নেয় -আর ছুটেঁ যায় সুতাবিহীন ঘুড়ির মতো। উড়তে থাকে আকাশের
শূণ্যদ্বীপে -মুক্তমনে -স্বাধীনভাবে। নেই কোথাও বিধিনিষেধ -রিলিজিওন-এর
দায়বদ্ধতা। শুধু ঘুরে বেড়ানো আর সময়ে পাঠশিক্ষা এবং ক্ষুধা নিবারণ করা।
তবুও সে স্বপ্ন দেখে একদিন এলএলবি পাশ করে -মানুষের প্রশংসা কুড়াবে। কি
কঠিন স্বপ্ন সেই অবুঝ বালকের (?) এখন সে অবুঝ বালকটি একাকী বসে চলে যায়
সেই সোনালি স্বপ্নের যুগে আর হাসে। কি জটিল মানুষের এই জীবন (?)।
যাহোক, প্রসঙ্গে আসি যা নিয়ে কিছু লিখবো বলে জটিল সৃষ্টির সাহায্য
নিয়েছি। প্রসঙ্গটা হচ্ছে “মানবতাবাদ” কিংবা “হিউমিনিজম”কে নিয়ে। আমি এর
সচ্ছতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সন্দেহ প্রকাশ করি, যখন ব্যাঙের ছাতারমতো গজানো
“মানবাধিকার সংস্থার” ফলকগুলোকে বিভিন্ন গণমাধ্যমসমূহে দেখি। “মানবতাবাদ
এবং মানবাধিকার” -এর দুয়ের পার্থক্যটা জানতে আমার মনের কৌতুহল বাড়ে। এর
জন্য যে তারপর বেশি বই পড়েছি তা ও নয় -বরং সকাল-বিকেলে নিজের
মনুষ্যত্ববোধের কাছে প্রশ্ন ছুড়েঁছিলাম আর উত্তর খুজেঁছিলাম। তাই আমার এই
লেখাটি কেবলমাত্র এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতারই ফসল। এক মানুষের সত্যিকার
মনুষ্যত্ববোধ কোথায় তা অনুসন্ধান করতে আমাকে এই ২৬ বছর বয়সে আসতে হয়েছে।
এখন নির্ধিদায় বলতে পারি “মানুষের গুণাবলীর স্থান বাইরের কোথাও নয় -বরং
একজন ব্যক্তিতেই সেসব নিহিত থাকে আর সেসব গুণাবলীকে আত্ম-প্রচেষ্টার
মাধ্যমে আবিষ্কার করা হচ্ছে জীবনের আসল উদ্দেশ্য -তাই স্বপ্রচেষ্টার
মাধ্যমে নিজস্ব মনুষ্যত্ববোধকে খুজেঁ পেতে হয় -যা সবকিছুর উর্ধ্বে”। এর আগ
পর্যন্ট কেউ সত্যিকার মানবতাবাদী হতে পারবে না -সে যতবড় প্রসিদ্ধ কিংবা
নামজাদা মানবতাবাদী কর্মী হোক -যে পর্যন্ট না সে নিজেকে শুধু এক মানুষ
হিসেবে চিনতে পারে। পৃথিবীতে বর্তমানে হরেকরকমের ব্যবসা হয় -এরই মধ্যে
“মানবাধিকার” ও একটি -যাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো এক ঘটনার পরবর্তীতে -উক্ত
ঘটনারই পরিপ্রেক্ষিতে পত্রিকায় লেখা, কিংবা টিভিতে প্রচার করা, অথবা
ওয়েবসাইট-এ নিজস্ব মতামতের উপর ভিত্তি করে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা -এই হলো
বর্তমান মানবাধিকার কর্মিদের কাজ। খুবিই সীমিত এবং হীন এক ব্যবসা। একদিন এক
নামকরা মানবাধিকার কর্মীর সাথে দেখা হলে নিজেই নিজের গোপনতা প্রকাশ করলেন
-বললেন যে কোনো এক সময় মালদ্বীপ সরকারের লঙ্ঘনকৃত অপরাধের বিরুদ্ধে লিখতে
যাবে শুনে -সরকার নাকি উনাকে ২ কোটি রুপি দিতে রাজী হয় -তার বিনিময়ে তবু ও
সংবাদ প্রচার না করা। আমিতো জানি সবগোপনী্য়তা। খেলেও কেউ কি কিছু বলবে
-হ্যাঁ, আমি খেয়েছি। দিলে ও কেউ কি বলবে -হ্যাঁ আমি এতো লক্ষ টাকা উনাকে
দিয়েছি সে যেনো সংবাদ না ছাপাই। খুবই নিরাপদ পেশা -এককথায় ঠান্ডামাথায়
দূর্নীতি। তবুও উনাদের কমবেশি যে মানবিক মূল্যবোধ নেই তা অস্বীকার করছি না।
পার্বত্য চট্রগ্রামে যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হয় -মূলত দুধরনের সংবাদ
গনমাধ্যমের কাছে পৌঁছাতে সংবাদমাধ্যমে ছাপানো হয়। এক: পাহাড়ি
সন্ত্রাসীরা নিরীহ বাঙ্গালীদের পল্লীতে তান্ডবলীলা চালিয়েছে, এর বর্ণনা
দিতে রামায়নের কাব্য বানানো হয়, নতুবা- দুই: মাঝেমাঝে আসতে পারে নিরপেক্ষ
নমুনায়, যেমন পাহাড়িদের গ্রামে আগুন -যা ঘটেছে মূলত এক অঙ্ঘাত দলের
কারণে। এই অঙ্ঘাত দলটি কে বা কারা -ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা আর মিলে না।
আর দেশহিতৌষী-বরেণ্য-সম্রাঙ্ঘী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কে একবিন্দু কথা বলার
সাহস রাখে। এখানে এসে সব সত্য ভূ-গর্ভের নিচে চলে যায়। সরকারকর্তৃক
লোকদেখানো মানবাধিকার সংঘ ঘটন করা হয় -ঘটনার সত্যটা কতিয়ে দেখবে বলে। আদৌ
কি কোনো সত্য উৎঘাটন হয়েছে (?) যা হয়েছে সবটা হয়েছে এর উল্টো
-বিকৃতভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উপর ভর করে পাহাড়িদেরকে চিহ্নিত করা
হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী মহল হিসেবে। যাদেরকে নিয়ে মানবাধিকারের সংঘ ঘটন
করা হয়েছে -উনারাতো আবার অল্পশিক্ষিত কিংবা নির্বোধ ব্যক্তি ও নন -উনারা
ওতো কোনো না কোনোভাবে মানবাধিকারের পেশা নিয়ে জড়িত। তাহলে -সত্য কেনো
তবুও গোপন থাকে (?)। কারণ একটাই, উনারা যদিও মানবাধিকারের কথা বলতে চান
-কিন্তু সত্যিকার অর্থে মানবতাবাদী হতে পারেন নি -অর্থাত্হ মনুষ্যত্ববোধ
সম্পর্কে জ্ঞান পরিধি সীমিত -সোজা কথায়, মানবতা কি জিনিস তা ভালোভাবে
হৃদয়ালব্ধী হয়নি অথবা জানেন না। হয়ত বা হতে পারে বাঙ্গালী জাতিয়তাবোধ
আদৌ উনাদের পিছু টানে -নতুনা মাইনে কমবে বলে চিন্তা করে। এই হচ্ছে বর্তমান
বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের কার্যকলাপ। হবে না ও কেনই বা -যে আমেরিকা
জাতিসংঘকে সিংহভাগ অর্থ যোগান দেয় বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্টার জন্য -আর সে
আমেরিকাই আবার আফগানিষ্টান এবং ইরাকে বোমা ফাটে সন্ত্রাসী নির্মূল করবে
চলনায়। আবার মানবতার দরদ দেখিয়ে উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমারের মতো অনগ্রসর
দেশগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কি নিষ্ঠুর মানবজাতি (?)। সবদিক দিয়ে
অবর্ণিত ক্ষতি নিরীহ জনসাধারণের উপরই সাধিত হচ্ছে।
মানুষের একটাই স্বভাব সহজে অন্য আরেকজনকে প্রভুত্ব আসনে বসিয়ে রাখা
-যারপরিপ্রেক্ষিতে রচনা করতে পারে নতুন অন্য এক কেতাব -আমার প্রভু
জনমানুষের কথা ভেবেছিলেন বলে নিজের জীবনের কথা চিন্তা করেন নি। আমার প্রভু
জনদরদী-হৃদয়বান ব্যক্তিদের একজন -এক কথায় অবিনশ্বর এবং
ইত্যাদি…..ইত্যাদি। এইসব হচ্ছে একধরণের সুবিধাবাদী মহলের প্রচারণা।
মানবতাবাদের টুপিটি কিন্তু এনারা আগে পড়েন। এনারা চেঁচিয়ে গলাফাতান
-যেকোনোভাবে হোক মানুষদের সামনে মানবতাবাদী সাজতে হবে। আবার নিরীহ কিন্তু
অল্পশিক্ষিত মানুষেরা এনাদের কথা সহজেই বিশ্বাস করেন -কারণ অধিকাংশ সমাজের
জনগোষ্ঠি আদৌ স্বশিক্ষিত হতে পারেননি যদিও উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন বটে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে “মানবতাবাদ” জিনিসটা কি -বস্তু নাকি ব্যক্তি (?)
মানবতাবাদের সত্যিকার তাৎপর্য অন্য আরেকজনকে হৃদয়ক্ষম করানো এক ধরনের
দুরদিগম্য ও বটে -কেননা মনুষ্যত্বকেতো নিজের মাঝে আগে খুজেঁ পেতে হয়।
মনুষ্যত্ববোধ হচ্ছে নিজেকে আগে শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে চেনা -যেখানে আটাঁ
থাকবে না রিলিজিওন-জাতি-বর্ণের ভেদাবেদ। নিজেকে আগে অনুধাবণ করা শুধুমাত্র
এক মানুষ হিসেবে -তারপর চিন্তার গভীরে নিয়ে যাওয়া সত্যিকার মানবিক
গুণাবলীগুলোকে অন্বেষনের প্রয়াসে। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করা -এক মানুষ
হিসেবে আমার কি কি গুণাবলী থাকার প্রয়োজন (?)। ধরুণ, আমি চিন্তা করছি আমার
মানুষ হিসেবে দরকার -অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থান। তারপর ধারাবাহিকভাবে চলে
আসে ভাষাগত-সংষ্কৃতিগত মৌলিক অধিকারগুলোর কথা। যা আমার আছে -অন্যদের ও থাকা
আবশ্যক, যা আমি পারি না -অন্যদের ও পারতে বাধ্য করবো না। আমার যা
স্বাধীনভাবে চিন্তাবিকাশের অধিকার -আমার মতো অন্য আরেকজনওটো চিন্তা করতে
পারে -যা উনার ও মৌলিক অধিকার। আমি যেমন রক্তে-মাংসে গড়া এক মানুষ, সে ও
টো এক মানুষ। আমার থাকতে পারে উনার কেনো থাকতে পারে না (?)। অর্থাৎ-প্রথমে নিজের মূল্যবোধকে আবিষ্কার করা -আর অন্যদের ও সেভাবে দেখা। তাকেই
বলে মানবতাবাদ। আর এই মানবতাবাদের সত্যিকার তাৎপর্যকে প্রচারের মাধ্যমে
জনমানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যতাই হচ্ছে মানবাধিকারের সংস্থাগুলোর
মূলমন্ত্র হওয়া উচিত বলে আমি নির্ধিদায় মনে করি।

No comments:
Post a Comment