আলোচনা করছিলাম 'আইডেন্টিটি ক্রাইসিস' বিষয়ে যাতে জড়ানো আছে মনস্তাত্ত্বিক
এবং সামাজিকতার ভিতর পূঁজিকৃত জাতীয় সংকটাপূর্ণ অস্তিত্বের প্রশ্ন । এর
প্রশ্নের ধরণ কালপাত্র এবং সময়ভেদে বিবিদ হতে পারে । 'অস্তিত্ব সংকট'
(পরিচয় সংকট-identity crisis) একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । ক্ষমতা
হ্যাকার বিশ্বায়ন যুগে এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিকভাবে
উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে উড়িয়ে দেয়া হয় যার কারণে নিদারূণ মনস্তাত্ত্বিক পীড়নে
যুবক ছেলে/মেয়েরা ভোগে । 'আইডেন্টিটি ক্রাইসিস' একটি মানসিক পীড়ন অর্থাৎ
সাইকোলজিক্যাল টার্ম । কিন্তু সামাজিকভাবে এর গুরুত্ব ও অস্বীকার করার মতো
না । একজন ব্যক্তি মনস্তাত্ত্বিক (psychological), সমাজতাত্ত্বিক
(sociological) এবং দর্শনগত (philosophical) এই তিনভাবে 'পরিচয় সংকট' নিয়ে
সন্ধিহান থাকেন । সামাজিক মনোবিজ্ঞান অনুসারে পরিচয় সংকটকে মূলতঃ জাতীয়
পরিচয় (national identity) এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় (cultural identity) এই
দুভাগে বিভক্ত করা হয় ।
আলোচনা চলছিল 'বাঙালী বিয়ে' বিষয়ক ।
দুপক্ষ থেকে যুক্তিখন্ডনের পাশাপাশি দোষাদোষি ও উপস্থিত । এর আলোচনার মূল
সূত্রপাত নতুনভাবে ঘটান 'জুম্ম কলঙ্ক' নামে এক অজ্ঞাত ফেইসবুক ব্যবকারী ।
অনেক ছেলে/মেয়ের কাছে 'জুম্ম কলঙ্কের' এমন অপরিপক্কতাকে মৌলবাদের উত্তান
বলে মনে হচ্ছে । 'মৌলবাদ' (fundamentalism) আসলে কি ? 'মৌলে' মানে শিকরে
আটকাটিয়ে থাকা । 'মৌলবাদ' কেন সৃষ্টি হয় ? আমরা যদি এর সৃষ্টির পিছনে
লুকিয়ে থাকা সত্যকে অস্বীকার করে মৌলবাদের উত্তাণকে রুখার চেষ্টাকরি তা
আদতে কি সম্ভব ? আদিবাসী জুম্ম জনগণের 'মৌলবাদ' কিংবা 'রক্ষণশীল'
(conservative) যাই বলেন না কেন, উত্তানের পিছনে যে সুষ্পষ্ট এক কারণ
বিদ্যমান তা নিয়ে আলোচনার করা দরকার । সামাজিক মনোবিজ্ঞানে বিদ্যমান 'জাতীয়
পরিচয়' এবং 'সাংস্কৃতিক পরিচয়' এ দুটি বিষয় নিয়ে বয়োঃসন্ধিবস্থায়
ছেলে/মেয়েরা প্রবলভাবে সন্ধিহান থাকে । এ সময়ই 'মৌলবাদ' কিবা 'রক্ষণশীলতার'
বীজ বপিত হয় । পার্বত্য সমস্যাটা আদিবাসী জুম্ম জনগণ এখনো ধর্মগত সমস্যা
হিসেবে দেখেন না, তাই ধর্মের মৌলবাদের সম্ভাবনা হীন হলেও সাংষ্কৃতিক এবং
জাতীয় মৌলবাদের সম্ভাবনা প্রচুর । মৌলবাদের আগমুহূর্তে সাধারণতঃ
রক্ষণশীলতাকে উপলব্ধি করা যায় অতঃপর মৌলবাদের সূচনা ঠিক যেসময় 'রক্ষনশীলতা'
অসহায় (ভুক্তভোগীদের দৃষ্টিতে) । তখনই সুইসাইড বোমা, হত্যা, বলাৎকরণ এবং
ইত্যাদি জোড়পাকড় শুরু হয় । জাতীয় পরিচয়াপূর্ণ সংকটের জন্য রাষ্ট্রের
ব্যর্থতা, বৈষম্য, বর্ণবাদী মানসিকতাই দ্বায়ী । এই 'জাতীয় পরিচয়াপূর্ণ'
সংকটে যেসব জাতিসম্প্রদায় শিকার তারা দলবদ্ধ হতে থাকে এবং প্রবল আন্দোলনের
মুখে তারা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে । তাই, পার্বত্য চট্রগ্রামে জুম্ম ছেলেদের
ভিতর যদি রক্ষণশীলতা কিংবা মৌলবাদের উত্তানই ঘটে থাকে সেজন্য পরিষ্কারভাবে
রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতিই দ্বায়ী । যতদিন জাতীয় পরিচয়ের সংকটাপূর্ণ
পরিস্থিতি মিটবে না ততদিন দিনেদিনে জাতীগোষ্ঠীর ছেলে/মেয়েরা কট্টর
রক্ষণশীলতা এবং মৌলবাদের দিকে ধাবিত হবে ।
উদাহরণ হিসেবে,
'বাঙালী জাতীয়তাবাদ' - '৫২-এর ভাষা আন্দোলন' - '৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ'
-'রাজাকার সনাক্তকরণ' -'পাকিস্তানিদের উপর তীব্রক্ষোভ' -'যুদ্ধাপরাধী'
ইত্যাদির জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকসম্প্রদায়ের দ্বৈতনীতিই দ্বায়ী ছিলো।
যেসব তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম-পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন
করেন তাদেরকে বলা হয় 'রাজাকার' + 'যুদ্ধাপরাধী' । আজ পর্যন্ত স্বদেশপ্রেমিক
বাঙালী জাতিগোষ্ঠীর কেউ পাকিস্তানি কোন নারী/পুরুষকে বিয়ে করা
স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না । আমার প্রশ্ন -মানতে না পারার কারণটা
কেন ? কারণটা ঠিক বর্তমানে আদিবাসী জুম্ম জনগণের ছেলে/মেয়েরা যেভাবে
"আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে' সম্মুখীন হয়ে 'বাঙালী জাতির' প্রতি তীব্র ক্ষোভের
ডানা জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক অনুরুপ । এরজন্য একচেঠিয়াভাবে এক
জাতিসম্প্রদায়কে দোষারোপ করা যায় না, যেহেতু এর পিছনে রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক
নীতি বিদ্যমান সমস্যার কারণ ।
তারপর ও জুম্মজনগণের সচেতন মহলে
সতর্ক থাকতে হবে যে, 'জুম্ম কলঙ্কের' মতো কার্যকলাপ কখনো প্রশংসাযোগ্য হতে
পারে না । নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান পাওয়া যাবে
না যদিও নারীদের অংশগ্রহণ খুবই জরুরী । এসব গুরুতর সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে
হলে যুবক ছেলে/মেয়েদের মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে সামাজিক সংঘটনগুলোকে
এগিয়ে আসতে হবে ।
ব্যক্তি-অধিকার:
ব্যক্তি-অধিকার !
ব্যক্তিই সমাজের এক ইউনিক সদস্য । তাকেই ভিক্তি করে পরিবার, সমাজ, জাতি তথা
দেশ । তাই ব্যক্তির স্বাধীনতা খুবই দরকারী বৈকি । অস্বীকার করার প্রশ্নই
উঠে না । তবে ব্যক্তির অধিকার যদি 'সামগ্রিক অধিকারের' সাথে পারষ্পরিকভাবে
জড়িয়ে থাকে, তখন ? উদ্বাহরনস্বরুপ; এক পরিবারে ৩ ভাই -২ বোন । ১ ভাই এবং ২
বোন ভার্সিটির ডিগ্রীদারী, উচ্চশিক্ষিত । শিক্ষিত ১ ভাই এবং ২ বোন অন্য
অশিক্ষিত ২ ভাইয়ের তুলনায় কলমে-কাগজে অধিকার সচেতন । অশিক্ষিত ২ ভাই জীবনে
যা কামিয়েছে সব খরচ করেছে অন্য ৩ জনের পড়াশুনার পিছনে । পারিবারিকভাবে অনেক
টানাহেঁচরার পরও এখন পরিবারটি নির্ভর করছে ৩ জন শিক্ষিতের উপর । অধিকার
সচেতন ২ বোন দাবী করছে তারা 'বেজাতি' বিয়ে করবে, এটা তাদের ব্যক্তি অধিকার ।
মা-বাবাসহ অন্য ২ অধিকার অসচেতন ভাই, সন্তান/বোনদের এমন সিদ্ধান্তে নারাজ ।
এক্ষেত্রে শুধু পারিবারিকভাবে নয় সামাজিকভাবে ও মা'বাবাকে প্রতিনিয়ত
হেনস্তা হতে হবে । কারণ সামাজিকভাবে এর গ্রহণযোগ্যতা আদৌ গৃহীত হয়নি ।
অশিক্ষিত ২ ভাইয়ের সোজা উত্তর এমন হলে আমরা তেষ্য করতে বাধ্য । অন্য ১
শিক্ষিত ভাই এখন জায়গা ভাগের সমান দাবী তুলছে । ভাইটির একটা চাকুরী ও হয়েছে
। এসবক্ষেত্রে, ব্যক্তির সমান অধিকারের চেয়ে মানবিক দাবীটি বেশি প্রাধান্য
হয়ে দাঁড়ায় । এখানেই 'মনুষ্যত্ববোধ' এবং 'অমনুষ্যত্ববোধ' গভীরভাবে কাজ করে
। এখানেই 'স্বার্থপর' এবং 'পরার্থপরতার' ব্যবধান প্রতীয়মান হয় । তাই শুধু
কলমে-কাগজে লিখিত অধিকার সচেতন হলে চলবে না, 'মনুষ্যত্ববোধকে" ও জাগিয়ে
তুলে পারষ্পরিক অবদান রাখার চেষ্টা প্রয়োজন । যে শুধু নিজের অধিকারকে
পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে অধিকার সচেতন হতে চাই, তাকে অধিকার সচেতন বলা যাবে
না হয়ত বা স্বার্থবাদী ।
ব্যক্তির আলাদা বৈচিত্র্যতা রক্ষার জন্য
আজকের 'ইন্ডিজিন্যাস পিপলস্ রাইটস্' (আদিবাসী অধিকার) । ধরা যাক, ৮০%
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী চাচ্ছেন মূল জাতিস্রোত বাঙালীদের সাথে মিশে
যেতে, বাকী ২০% চাচ্ছেন যেকোনপ্রকারে নিজেদের আলাদা বৈচিত্র্যতা রক্ষা
করবেন, এখানে সমান অধিকারের যে মানবিক দাবী ৮০% জনগোষ্ঠীর জন্য উপেক্ষিত
হলে ও ২০% জনগোষ্ঠীর পক্ষে অধিকার রক্ষার যৌক্তিকতা চলে যায় ।
"দি
ইন্ডিভিজ্যুয়াল চয়েচ ইস নট দি ইন্ডিভিজ্যুয়াল রাইটস্" (ব্যক্তির নিজস্ব
পছন্দ ব্যক্তির অধিকার নয় ) । যদি বলা হয় ব্যক্তির অধিকার আছে তার নিজস্ব
ভালমন্দ যাচাই করে পছন্দের কিছু বেছে নিতে পারবে; প্রসঙ্গক্রমে, সেহিসেবে
যে কারোর অধিকার থাকবে পছন্দের এক পেশা বেছে নেয়ার -যেমন, পতিতাবৃত্তি
(যেহেতু অনেক দেশে এর বৈধতা আছে), পর্ণস্টার (পশ্চিমাতে এর মূল্যায়ন আছে)
এবং ইত্যাদি । যারা অধিকার নিয়ে যথেষ্ট সচেতন তাদেরকে আরো বেশি সচেতন হতে
হবে মানবিক দাবীর দিকে নজর রেখে । রাহুল গান্ধীর বান্ধবী পশ্চিমা একজন,
রাহুম গান্ধী যদি চান সমাজ/রাজনৈতিক বাদ দিয়ে সে ব্যক্তিগতভাবে সুখী হতে ।
এতে সমস্যা দেখি না, সেটা তার পছন্দ । যখন রাজনৈতিক এবং জাতীয় পছন্দের উপর
চলে আসেন তখন বিয়ে করাটা গৌণ হয়ে দাঁড়ায় ।
মানুষের মানবিক
মূল্যবোধ ব্যতীত সমস্যাগুলোর মূল উত্তানকে মূল্যায়ন করা যাবে না, তদুপরি এর
থেকে মুক্তির সম্ভাবনা ও ভীষণ হীন । আবেগবঃশত অনেককিছু বলা যায়, দাবী করা
যায়, দোষ দেয়া যায়, তাতে কি সমাধান ? গালাগালি, রেষারেষিই কি সমস্যার ইতি
নাকি মানবিক মূল্যবোধ ? সচেতনতা কি প্রতিশোধ, নাকি মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ
? উপসংহারের আগে সূচনা, তাই সূচনা ব্যতীত উপসংহারে পৌঁছানো মানে নিয়মভঙ্গ,
বিশৃংখলা । শিক্ষিতদের সচেতন হতে হবে, মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে অতঃপর
অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলে/মেয়েদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা দেয়ার দ্বায়িত্ব
হাতে নিতে হবে । প্রতিটি সমস্যার যখন কারণ আছে তাই ঢালাওভাবে কু-মন্তব্য
করা নিষ্প্রয়োজন ।

No comments:
Post a Comment